বাসুনকে, মা
লুনা শীরিন
পর্ব ২৬

বাসুন,

গত পর্বের লেখায় তোকে বাংলাদেশের ব্যারিস্টার সারা হোসেনর কথা বলেছিলাম। আজ  সপ্তাহের মাঝের একটা দিন মঙ্গলবার। আজই সারা আপার সাথে সেমিনারে দেখা হয়েছিলো দীর্ঘ ১২ বছর পর। আপা সেমিনারের  মাঝখান থেকে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমারও ভালোলাগার কোন কমতি ছিলো না। গোটা সেমিনারেই আমি শুধু ঘুরে ঘুরে আপাকে দেখছিলাম

তখন টরোন্টোতে মধ্য দুপুর। সোয়া দুইটা হবে। ঢাকাতে তখন রাত সাড়ে বারোটা। আমি সেমিনার শেষ করার আগেই বের হয়ে পড়েছিলাম। বাসে উঠবো এমন সময় ছোটবোন ঢাকা থেকে সেল ফোনে ম্যাসেজ  পাঠালো, আমি এখুনি ওকে ফোন করতে পারি কি না? কেমন করে করবো? ফোন কার্ডতো  নেই আজকে অফিসের আরো একটা প্রোগাম শেষ করে যখন রাত সাড়ে আটটায় (এখন টরোন্টোতে সাড়ে নয়টা অব্ধি বিকেলের আলো থাকে) বাসায় ঢুকেছি, তখন দেখি সেল ফোনে  ঢাকা থেকে আম্মুর ম্যাসেজ। খুব খটকা লাগলো মনে। দুপুরে  শাহিন ফোন করেছে। এখন এই ভোর বেলা আম্মু, ব্যাপার কি? বাইরের  কাপড় না ছেড়েই ঢাকাতে ফোন ঘুরাই। তখনই আম্মু দুসংবাদটা দিলেন। অন্তু গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে সেই ঘোর আমার এখনো কাটেনি

বাবু, তুই যখন বড় হয়ে এই লেখা পড়বি তখন জানতে পারবি যে, তোর মায়ের জীবনের অনেক অনেক সুন্দর সময়ের একটা পর্ব কেটেছে সাভারের  বিপিএটিসিতে (বাংলাদেশ পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং সেন্টার) ক্যাস্পাসটা যখন কেবল গড়ে উঠছে তখন আমরা ঢাকা থেকে ওখানে চলে যাই সম্ভবত তোর নানাভাই সেই ক্যাম্পাসের দ্বিতীয় পরিচালক যিনি ফ্যামিলি নিয়ে ওখানে থাকতেন সেই ক্লাস নাইন, টেন, ইলেভেন, টুয়েলভ এর সময়গুলোতে আমাদের সাথে কিছু পরিবারের সখ্যতা ছিলো। যা এখনো একইভাবে অটুট আছে তাদের ভিতর অন্যতম ছিলেন জবান আফতাবউদ্দিন খান। যিনি সম্ভবত পরে হেলথ সেক্রেটারী হিসেবে অবসর নেন আফতাব আংকেলের বৌকে আমরা ভীষন পছন্দ করতাম। কারন আন্টি নিজে খুব বেশী  সাবলীল একজন মানুষ ছিলেন। আন্টির দুই মেয়ে শান্তু আর অন্তু।

আমি যখনকার কথা লিখছি তখন ওরা ক্লাস টু/থ্রিতে পড়ে। আন্টি নিজের মেয়েদের নিয়ে খুব মজা করে কথা বলতেন। শান্তু বেশ বোকা বোকা ছিলো। ছোটবেলাতে দেখতেও একটু নাদুস নুদুস ছিলো। তাই সবাই নাকি আন্টিকে বলতো, আপনার বড়মেয়েটা তো বেশ সোজা সরল।বুদ্ধি-সুদ্ধি একটু কমই আছে। ছোট মেয়েটা(অন্তু) এত চালাক। ওকে নিয়েই তো বেশী মুশকিল হবে আজকের শিক্ষা সচিব জনাব আমিনুল ইসলাম ভুইয়াও তখন আমাদের ওখানেই থাকতেন। ভুইয়া আংকেলের মেয়ে আর অন্তু  একসাথে খেলতো। তখন ওয়ান/ টু তে পড়ে হয়তো। একদিন অন্তু ভুইয়া আংকেলের মেয়ের সাথে কথা কাটাকাটি করতে গিয়ে বলেছিলো, দেখো তোমার বাবা আমার বাবাকে স্যার ডাকে। তুমি আমার সাথে ঝগড়া করবে না। সেই কত ছোটবেলার কথা। অন্তুর এমন পাকনা কথা আমাদেরও ভীষণ ভালো লাগতো। আন্টিকে সবসময় বলতাম দেখবেন আন্টি অন্তু  জীবনে অনেক বড় হবে।

আন্টি একদিন আমাদের বাড়িতে এসে গল্পের ছলে বলছিলেন, কেউ যখন আমাকে বলে আপনার বড় মেয়েটা বোকা আমি তখন খুব রাগ হই। কারন বোকা, সোজা-সরল হবার জন্য কোন গুণ লাগে না, বুদ্ধি লাগে না। কিন্তু চালাক হবার জন্য যোগ্যতা লাগে আফতাব আংকেলের সেই চালাক চটপটে মেয়েটাই গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে। কারণ ও কয়েক মাকর্স এর জন্য এমএ তে প্রথম শ্রেণী পায়নি। ডিপ্রেশনে আমাদের সেই ছোটবেলার বোন অন্তু আত্মহত্যা করেছে একটা ২৩/২৪ বছরের জীবন কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই শেষ এই কি এখনকার ঢাকায় বড় হওয়া ছেলেমেয়েদের আবেগ? এই কি জীবনের গতি? ঢাকাতে নাকি তরুণ ছেলেমেয়েরা বিশ্বের অন্য দেশের চেয়েও অনেক ফার্স্ট?? এই কি তরুণ যারা সামান্য ব্যার্থতাকে সহজভাবে গ্রহণ করতে জানে না? এই গভীর রাতে আমি এই লেখা যখন লিখছি শুধু মনে পড়ছে আমার বাবা/ মায়ের কথা। বাবা একদিন বলেছিলেন, পরীক্ষায় ফেল করেছো তো কি হয়েছে। আজকে যদি তোমার চোখ না থাকতো তুমি কি তা ফেরত পেতে? পরীক্ষাতো বহুবারই দিতে পারবে

আন্টি তাহলে কিভাবে বড় করলো অন্তুকে যে ও সামান্য পরীক্ষার ফলাফলকে চ্যালেঞ্জের সাথে নিতে পারলো না? অন্তুর  মারা যাওয়াকে মেনে নিতে হলে তো বলতে হয় ইতিমধ্যে আমার অন্তত ১০/১২ বার আত্মহত্যা করা উচিত ছিলো?

এখন ঢাকাতে সকাল দশটা। সবাই নাকি আফতাব আংকেলের বাড়িতে , আমি প্রথম আলোতে অন্তুর  নিউজ পড়লাম। কি রে অন্তু  আপু। এই সামান্য অভিমানে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলি? এই যে শেষবার ২০০৬ এ যখন ঢাকাতে গেলাম তুই না আমাকে বললি টরোন্টোতে আসবি পড়তে? কেন এত অল্পতেই জীবনকে ধ্বংস করলি আপু?

বাসুন, আর লিখবো না বাবু। কাল আবার সারাদিন ধরে সেমিনার আমার সেই মহান শিক্ষক সরদার ফজলুল করিম যিনি বলেন জীবন জয়ী হবেই হবে। মানুষ  যতবার পড়বে ততবার সোজা হয়ে দাড়াবে। বাবু, আমি তোর এবং আগামী প্রজন্মের ভিতর সেই জীবনজয়ী সাহসের প্রতিচ্ছবি দেখতে চাই অন্তুর  পরপারের জীবন সুখের হোক

তোর মা,

৫ই জুন, ২০০৮।.

Email:lunasamir@yahoo.com

পর্ব ২৫                                                                            পর্ব ২৭