আমার চোখে একাত্তর

ইরতিশাদ আহমদ 

(তৃতীয় পর্ব)  

সত্তরের বারোই নভেম্বর যেন কেয়ামতের দিন ছিল পূর্ব বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলে। রাতের অন্ধকারে বিশ থেকে পঁচিশ ফুট উঁচু জলোচ্ছাস নিমেষে ডুবিয়ে দেয় দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা। মৃত্যুর বিভীষিকায় হতবুদ্ধি হয়ে যায় পূর্ব বাংলার জনগন। ফেটে পড়ে বিক্ষোভে। খবরের কাগজে শিরোনাম হয়, কাঁদো বাঙ্গালী কাঁদো বীভস সব ছবি আর খবর আসতে থাকে উপদ্রুত অঞ্চল থেকে। মানুষের ক্ষোভ বাড়তে থাকে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দেশের বাইরে ছিলেন। এসেই লোকদেখানো হাওয়াই চক্কর দিলেন হেলিকপ্টারে চড়ে ঝড়ে বিধ্বস্ত এলাকাগুলির ওপর দিয়ে। প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টাদের কেউই, এমনকি বাঙ্গালী সদস্যরাও, ইসলামাবাদ থেকে ঢাকায় আসলেন না। ক্ষোভ পরিণত হতে থাকে ক্রোধে। 

এর আগে পর্যন্ত দেশের অবস্থা সামরিক আইন সত্ত্বেও মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল। রাজনৈতিক কর্মকান্ডে এবং সভা-সমিতি অনুষ্ঠানে কোন বাধানিষেধ ছিল না। ইয়াহিয়া সরকার নামমাত্র মূল্যে সিনেমা হল গুলিতে ছাত্রদের ছবি দেখার সুযোগ করে দেয়। আইডেন্টিটি কার্ড দেখালেই কম দামে টিকেট কেনা যেত। সামরিক সরকারকে এই বুদ্ধিটা কে দিয়েছিল কে জানে, উদ্দেশ্য ছিল ছাত্রদের রাজনীতি-বিমুখ রাখা; কারণ আটষট্টি-ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের নায়ক ছিল ছাত্ররা। তাদের ধারনা ছিল বেশি বেশি করে সিনেমা দেখলে ছাত্ররা আর রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাবেনা, আন্দোলন-সংগ্রামে উসাহী হবেনা। বলিহারি বুদ্ধি বটে! তবে এটা ঠিক যে, ওই সময়ে সিনেমা হলে গিয়ে আমি যত ছবি দেখেছি, পরের দশ বছরেও অতটা দেখিনি। এই সময়ের উল্লেখযোগ্য দুটি বাংলা ছবি হলো, জীবন থেকে নেয়া, আবিন্দু থেকে বৃত্ত।  জীবন থেকে নেয়া ছিল বাঙ্গালীর স্বাধিকার আন্দোলনের দাবীকে থিম করে জহির রায়হানের একটা প্রতীকধর্মী চলচ্চিত্র। আমার সোনার বাংলা, কারার ওই লৌহ কপাট গানগুলি এই ছবিতে ছিল। এই ছবিটা তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।  বিন্দু থেকে বৃত্ত দর্শকপ্রিয় ছবি হতে পারেনি।  কিন্তু এই ছবিটাকে আমি আমার দেখা গুটিকয়েক ভাল ছবির মধ্যে একটা বলে মনে করি। মনে পড়ে, চাটগাঁর সিনেমা প্যালেসে আমি পরপর দুইদিন ছবিটা দেখেছিলাম। ছবিটা প্রযোজনা করেছিলেন ফখরুল আলম  আর পরিচালনায় ছিলেন রেবেকা। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় টাইপের মধ্যবিত্ত জীবনে প্লেন লিভিং হাই থিংকিংএর মাহাত্ম্য ছিল এই ছবির থিম। সত্যিই খুব ভালো লেগেছিল।   

ছবির কথা থাক, নির্বাচনের কথায় ফিরে আসি।  

নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমনিতেই ছিল বিষ্ফোরণোম্মুখ। বারোই নভেম্বরের ঝড় যেন অপ্রত্যাশিতভাবে সেই বিষ্ফোরণটাকেই ঘটিয়ে দিল। নির্বাচন নিয়ে মানুষের মাঝে যে উসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছিল তা পরিণত হলো বিক্ষুদ্ধ উত্তেজনায়। নির্বাচনের আর প্রয়োজন আছে কিনা এ নিয়ে শুধু সংবাদপত্র আর রাজনীতিকরাই নয়, সাধারণ মানুষও প্রকাশ্যে আলোচনা করতে শুরু করলো।  ঝড়ের কারণে নির্বাচন পেছানোর কথাও উঠলো।  

শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগের নেতারা চিন্তিত হলেন। নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তাদের ভাবিয়ে তুললো। নিশ্চিত জয়ের সম্ভাবনা যে নির্বাচনে, তা পিছিয়ে যাক এটা তাদের কাম্য ছিল না। কোন একটা দৈনিক পত্রিকায় এক উপসম্পাদকীয়ের শিরোনাম ছিল, শেখ মুজিবের সাথে প্রকৃতির বিশ্বাসঘাতকতা। শেখ মুজিব ঘোষণা দিলেন, আরো দশহাজার মানুষের মৃত্যু হলেও নির্বাচন পিছাতে দেয়া হবে না। (নির্মল সেন, আমার জবানবন্দী, তরফদার প্রকাশনী, ২০০৬) তখনো পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা যে পাঁচ লাখের কাছাকাছি তা জানা ছিল না। কয়েক হাজার মাত্র মারা গেছে, মনে হয় এই ধারণার বশবর্তী হয়েই শেখ মুজিব উপরোক্ত মন্তব্যটা করেছিলেন। এই মন্তব্য যে খুব একটা সংবেদনশীল ছিলনা, তা বোধহয় বলার অপেক্ষা রাখেনা।  

বারোই নভেম্বরের ঝড় শেখ মুজিবকে তাক্ষণিক ভাবে চিন্তায় ফেললেও, পরে দেখা গেল এই ঝড়ের পরিণতিতে আওয়ামী লীগই সবচেয়ে বেশী লাভবান হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সারাদেশে নির্বাচন পূর্বনির্ধারিত তারখেই (সত্তরের সাতই ডিসেম্বরে) অনুষ্ঠিত হয়েছিল, উপকূলের কয়েকটি নির্বাচনী এলাকা বাদ দিয়ে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ঐতিহাসিক জয়। আওয়ামী লীগ জিতবে এই ধারনা মোটামুটি সবারই ছিল, কিন্তু এত ভোট পেয়ে এতগুলি আসনে জিতবে, তা ছিল অচিন্তনীয়, অনেকেরই কল্পনার বাইরে। আওয়ামী লীগের বিশাল নির্বাচনী সাফল্যের পেছনে বারোই নভেম্বরের ঝড়ের প্রভাব ছিল এতে কোন সন্দেহ নেই।  

কোন কোন বিদেশী সাংবাদিকদের সাম্প্রতিক লেখায় দেখি বলা হয়, এই ঝড়ের কারণেই পুর্ব পাকিস্তান পশ্চিমাংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং স্বতন্ত্র রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। যেন এই ঝড়টা না হলে বাংলাদেশ হতো না। এই বিশ্লেষন অতি সরলীকৃত এবং ভুল ধারনার উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এই ধরনের ভুল বিশ্লেষনই প্রমাণ করে এই প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী ।    

নির্বাচন পেছানোর ব্যাপারে শেখ মুজিবের মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তিনি যে একজন কৌশলী এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিক ছিলেন তা নিয়ে তর্কের অবকাশ নেই । এই নির্বাচনে জিততে পারলেই যে তিনি পুর্ব বাংলার একচ্ছত্র এবং অবিসম্বাদিত নেতায় পরিণত হতে পারবেন এটা তাঁর মতো করে আর কেউই তেমন বুঝতে পারে নি। যদিও শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা তখনই আকাশছোঁয়া, তিনি জানতেন শুধু জনপ্রিয়তা দিয়ে কাজ হবেনা। নির্বাচনে জয়লাভের ফলে যে গ্রহণযোগ্যতা তিনি পাবেন তার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। শুধুমাত্র দেশবাসীই নয়, সামরিক সরকারও এর ফলে তাঁকে জনগণের একমাত্র প্রতিনিধি হিসাবে মেনে নিতে  বাধ্য হবে। তাঁর এই ধারণা যে সঠিক ছিল পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তাই প্রমাণ করে। 

মৌলানা ভাসানী ও তাঁর সমর্থকরা আগেই নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়েছিলেন, বারোই নভেম্বরের পরে আর রাখঢাক করলেন না। সোজাসুজি স্বাধীনতার ডাক দিলেন।

এই সময়ে মৌলানা ভাসানীর ভুমিকা তাঁকে মানুষের খুব কাছাকাছি নিয়ে আসে। তিনি যেন মানুষের কথাই বলছিলেন।  ঝড়ের আগে তাঁর দেয়া শ্লোগান ভোটের আগে ভাত চাই তেমন সাড়া জাগাতে পারে নি। এই শ্লোগানটি সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে খুব একটা বাস্তবোচিত ছিল বলেও মনে হয় না।  কিন্তু ঝড়ের পরের স্বাধীনতার ডাক মানুষ লুফে নিয়েছিল। এমন কি তখন আওয়ামী লীগের মিটিং-মিছিলেও স্লোগান উঠতো, ছয় দফা না, এক দফা; এক দফা, এক দফা। এক দফার অর্থ ছিল স্বাধীনতার দাবী।  মৌলানা ভাসানী অবশ্য বলতেন, স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান চাই।  তাঁর যুক্তি ছিল, ঊনিশশো চল্লিশের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে বাংলার মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমির দাবী এখনো তোলা যায়। কিন্তু আমার মনে হয়, স্বাধীনতার দাবীর প্রতি মানুষের সায় থাকলেও স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের উল্লেখ বিভ্রান্তির জন্ম দেয়। ভাসানী অবশ্য সাধারণ মানুষের ভাষায় যুক্তিটা দিতেন এই ভাবে, পাকিস্তান আনছি আমরা, পাকিস্তান আমাদেরই থাকবে, আমরা আলাদা হইতেছিনা, তোমরাই বাইর হয়া যাও। এই সময়কার জনসভাগুলিতে মৌলানা ভাসানী তাঁর বক্তৃতায় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য বাঙ্গালীরা কি কি ত্যাগ স্বীকার করেছে তার ফিরিস্তি দিতেন। পশ্চিম বাংলার পাটকল থেকে মালদহের আম কিছুই তাঁর বর্ণনা থেকে বাদ পড়তো না। বামপন্থীরাও (মস্কোপন্থীরা ছাড়া) এই সময়ে স্বাধীনতার দাবীকে সামনে নিয়ে আসতে থাকে জোরেশোরে। এই সময়ে আমাদের শ্লোগান ছিল, আসাদের মন্ত্র, জনগণতন্ত্র; কৃষক-শ্রমিক অস্ত্র ধর, পূর্ব বাংলা স্বাধীন কর। লক্ষ্যনীয় যে, বামপন্থীরা ভাসানীর পেছনে থাকলেও, তাদের বেশীর ভাগই পূর্ব পাকিস্তান নয় পূর্ব বাংলার স্বাধীনতাই চেয়েছিলেন।  

তবে আমার ধারনা, ভাসানীর স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান দাবীর পেছনে অন্য একটা কারণ ছিল। ভাসানী তখন থেকেই ভারতকে নিয়ে সন্দিহান ছিলেন । আমাদের স্বাধীন হওয়ার প্রক্রিয়ায় ভারত অযাচিত এবং স্বার্থপর প্রভাব খাটাতে পারে তাঁর এই আশংকা ছিল। আশংকাটা অমূলক ছিল না নিশ্চয়ই। ভাসানীও অত্যন্ত বিচক্ষণ এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা ছিলেন। যুদ্ধের নয় মাস তাঁকে ভারতে অন্তরীণ অবস্থায় থাকতে হয়েছিল, এতে কি প্রমাণিত হয়?  

শেখ মুজিবও বা কেন একাত্তরের পঁচিশে মার্চের রাতে সুযোগ থাকা সত্বেও তার দলের অন্যান্য নেতাদের মতো সীমান্ত পার হয়ে ভারতে সরে যাওয়ার চাইতে পাকিস্তানীদের হাতে ধরা দেওয়াটাকে শ্রেয় মনে করেছিলেন এ প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে। ভারতে যাওয়ার জন্য শেখ মুজিব এক পা বাড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন না, এতো আজ সবারই জানা। সম্প্রতি প্রকাশিত আফসান চৌধুরীর একটা লেখা থেকে জানা যায়, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের পূর্ব-অভিজ্ঞতা শেখ মুজিবের জন্য খুব একটা সুখকর ছিল না (Afsan Chowdhury, ”Sheikh Mujib: Three Phases, two histories, one puzzle,” Forum, the Daily Star, Vol. 3, Issue 4, April 2008) শেখ মুজিব ভারতের ওপর আস্থা রাখতে পারেন নি।  

মৌলানা ভাসানী এবং শেখ মুজিব দুজনেই চল্লিশের দশকে পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। শুধু জড়িত ছিলেন বললে সবটাই বলা হয় না; বলা উচি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাদের দুজনেরই অত্যন্ত সক্রিয় এবং নেতৃস্থানীয় ভূমিকা ছিল। একজন যৌবনে আর একজন অপেক্ষাকৃত তরুণ বয়সে সে আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের ভাবাবেগ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের ইতিহাস ও তার স্মৃতির সাথে জড়িয়ে ছিল, এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায় না। অন্যদিকে সত্তরের পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে ছাত্রদের প্রভাব ছিল অপরিসীম। ঊনসত্তরে ছাত্রদের এগারদফা ছয়দফাকে ছাপিয়ে গণমানুষের দাবীতে পরিণত হয়। এগারদফা ছিল চারটি ছাত্র সংগঠন (দুই ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ ও এন,এস,এফ এর একটা অংশ) ও ডাকসুর সমন্বয়ে গঠিত সম্মিলিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ প্রণীত কর্মসূচী। এই ছাত্রদের কারোরই, এবং তখনকার অনেক তরুণ রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে অনেকেরই, পাকিস্তান আন্দোলনের সময়ে জন্মই হয় নি। কারো কারো হয়ে থাকলেও, তাদের বয়স তখন এতই অল্প ছিল যে, পাকিস্তান আন্দোলনের তেমন কোন প্রভাব তাদের উপর পড়েনি। স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানকে নিয়ে এদের মাঝে কোন আবেগ বা পিছুটান ছিল না।

সত্তর-একাত্তরের পূর্ব বাংলায় রাজনীতির প্রেক্ষাপটকে বুঝতে হলে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিবর্গ এবং গোষ্ঠীসমুহের মন-মানসিকতার এই দ্বন্দ-সংঘাতগুলিকেও সঠিকভাবে বোঝার চেষ্টা করা উচি

 

(চলবে)

২২ জুলাই, ২০০৮


ড. ইরতিশাদ আহমদ ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কন্সট্রাকশন ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক এবং চেয়ারপার্সন। তিনি জার্নাল অব ম্যানেজমেন্ট ইন ইঞ্জিনিয়ারিং এর সম্পাদক।    ইমেইল : irtishad@gmail.com